বাইতুল মোকাররামের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে

প্রকাশিত: 4:16 PM, June 12, 2022

বাইতুল মোকাররামের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে

বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ। এর স্থাপত্যশৈলীও দৃষ্টিনন্দন। মক্কাতে অবস্থিত পবিত্র কাবাঘরের আদলে তৈরি মূল মসজিদটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। মানুষ অনেক দূর থেকেও এখানে ইবাদত করতে আসেন। ঘুরে ঘুরে মসজিদের সৌন্দর্য্য উপভোগ করেন। ছবি কিংবা ভিডিও ধারণ করেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে বায়তুল মোকাররমের দেয়াল ঘেঁষে ব্যবসা করছে অসংখ্য হকার। প্রতিনিয়তই চলছে তাদের হাঁকডাক। ময়লা- আবর্জনায় নষ্ট হচ্ছে মসজিদের চারপাশের পরিবেশ। হারিয়ে যাচ্ছে বায়তুল মোকাররম মসজিদের সৌন্দর্য্য।

১৯৬৮ সালে মসজিদটি নির্মিত হয়। তৎকালীন পাকিস্তানের বিশিষ্ট শিল্পপতি লতিফ বাওয়ানী ও তার ভাতিজা ইয়াহিয়া বাওয়ানীর উদ্যোগে এই মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়। ১৯৫৯ সালে ‘বায়তুল মোকাররম মসজিদ সোসাইটি’- গঠনের মাধ্যমে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়।
পুরান ঢাকা ও নতুন ঢাকার মিলনস্থলে মসজিদটির জন্য ৮.৩০ একর জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়। সেই সময় মসজিদের অবস্থানে একটি বড় পুকুর ছিল। যা ‘পল্টন পুকুর’- নামে পরিচিত ছিল। পুকুরটি ভরাট করে ১৯৬০ সালের ২৭শে জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান মসজিদের কাজের উদ্বোধন করেন। আটতলা বিশিষ্ট মসজিদে একসাথে ৩০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। তাই ধারণক্ষমতার দিক দিয়ে এটি বিশ্বের ১০ম বৃহত্তম মসজিদ। সরজমিন দেখা যায়, মসজিদের নিচতলায় রয়েছে বিপণিবিতান, গুদামঘর, জুয়েলারি ও বই-পুস্তকসহ বিভিন্ন মার্কেট। মসজিদের দোতলা থেকে খতিব নামাজ পড়ান। ৮.৩০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত মসজিদের চারপাশ ঘিরেই রয়েছে অসংখ্য হকার।

এসব হকারের কারণে ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদটি তার চিরচেনা রূপ হারাতে চলেছে। জানা গেছে, এক সময় এই মসজিদ সীমানা ঘিরে কোনো হকার ছিল না। শুধু নিচতলায় কিছু জুয়েলারি ও বই পুস্তকের দোকান ছিল। এখন নতুন নতুন অনেক দোকানই গড়ে উঠেছে। মসজিদের আওতায় বর্তমানে ৮ শতাধিক দোকান রয়েছে। এরমধ্যে শুধু জুয়েলারির দোকান রয়েছে ২৫০ টির মতো। মসজিদের পাশে উত্তর-পশ্চিম কোণে এক সময় বড় ফুলের বাগান ছিল। এখন তা নেই। মসজিদের দক্ষিণ পাশের ফটকের প্রবেশ পথের পাশ দিয়ে ফুচকা, জামাকাপড়, বই ও শরবতের দোকানসহ বিভিন্ন হকার পসরা সাজিয়ে বসেছেন।
মসজিদের প্রবেশ পথের ভিতরে সিঁড়ির উপরেও জামাকাপড় ও মধু বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া সিঁড়ির নিচে মুচিসহ কিছু হকার নিয়মিত দোকান করেন। এসব হকারের কারণে মসজিদের দক্ষিণ ফটকের সৌন্দর্য্য নষ্ট হচ্ছে। ভিতরে প্রবেশের ক্ষেত্রেও মুসল্লিদের বাধা পেতে হয়। বায়তুল মোকাররমের উত্তর ও পূর্ব পাশের গেটের সামনেও চৌকি বসিয়ে হকাররা হাঁকডাক করে জামাকাপড়সহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করছেন। তাদের এসব পণ্য ছোট চৌকিতে রাখার পাশাপাশি উপরে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকায় বায়তুল মোকাররমের সীমানা প্রাচীর ঢাকা পড়েছে। এছাড়া পুরো মসজিদের চারপাশের সীমানা ঘিরে ভাতের হোটেল, ফাস্টফুডের দোকান, চা-সিগারেটের দোকান ও পাবলিক টয়লেট গড়ে উঠেছে। এসব দোকানের কারণে বায়তুল মোকাররমের চারপাশে প্রতিনিয়ত প্রচুর ময়লা-আবর্জনা জমে যাচ্ছে। যা পুরো মসজিদের পরিবেশ নষ্ট করছে।

মুসল্লিরা জানান, বায়তুল মোকাররমে নিয়মিত মুসল্লি ছাড়াও অনেকে দূর থেকে ইবাদত করতে আসেন। কেউবা মসজিদ দেখতে আসেন। বিশেষ করে জুমার দিনে অনেক মুসল্লির সমাগম হয় এখানে। কিন্তু মসজিদের সীমানা ঘেঁষে চারপাশের হকার আর নোংরা পরিবেশ দেখে বিস্মিত হন তারা। এতে মসজিদের সামগ্রিক পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। সূত্র বলছে, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কারণে মসজিদের দেয়াল ঘেঁষে গড়ে ওঠা হকারদের উচ্ছেদ করা যায় না। ভ্রাম্যমাণ এসব দোকান থেকে প্রতিদিনই বড় অঙ্কের চাঁদা তোলা হয়। যার ভাগ চলে যায় এসব ব্যক্তিদের পকেটে। তাই এর আগে কয়েকবার উচ্ছেদ করা হলেও ফের বায়তুল মোকাররমের চারপাশ দিয়ে হকাররা তাদের রাজত্ব কায়েম করেছে। প্রায় ৩০ বছর ধরে বায়তুল মোকাররম মসজিদে নামাজ পড়েন হোসাইন আকন্দ নামের এক জুয়েলারি ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, আগে মসজিদের চারপাশ অনেক সুন্দর ছিল। কোনো হকার ছিল না। তবে এখন চারপাশেই হকার। এটা মসজিদের সৌন্দর্য্য নষ্ট করছে। আশরাফ আলী নামের আরেক মুসল্লি বলেন, ১৫-২০ বছর আগে মসজিদের চারপাশের চিত্র এমন ছিল না।

ধীরে ধীরে জায়গাগুলো হকারদের দখলে চলে গেছে। এখন চারপাশের কোথাও কোনো ফাঁকা জায়গা নেই। বাহির থেকে বোঝাই যায় না এটা মসজিদ। বায়তুল মোকাররম মার্কেটের গ্রামীণ ডায়মন্ড হাউসের নিতাই কর্মকার বলেন, আগে নিচতলায় শুধু জুয়েলারির দোকান ছিল। এখন তো হকার আর হকার। মার্কেট সমিতি হকারদের উঠাতেও পারে না। বায়তুল মোকাররম ব্যবসায়ী গ্রুপের অফিস সচিব আহমেদুল হক বলেন, আমরা কেউ চাই না মসজিদের পাশে ফুটপাথ। আমরা সব সময় তাদের উচ্ছেদ করতে বলি। কিন্তু তাদের উচ্ছেদ করা হয় না। অনেক আগে থেকেই ধীরে ধীরে হকাররা এখানে ব্যবসা করছে। এতে মসজিদের সৌন্দর্য্য ব্যাহত হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক কর্মকর্তা জানান, মসজিদের চারপাশের হকার বসানোতে বায়তুল মোকাররম কর্তৃপক্ষের কোনো যোগসাজশ নেই। এটি স্থানীয় সরকার দলীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে। এজন্য অনেক চেষ্টা করেও তাদের উঠানো যায় না।

সর্বশেষ সংবাদ