মাকড়সার ঘর ও একটি আয়াতের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

প্রকাশিত: 4:54 AM, December 22, 2021

মাকড়সার ঘর ও একটি আয়াতের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

নিউজ ডেস্কঃ পবিত্র কোরআনে ‘আনকাবুত’ নামে একটি সুরা আছে। যার অর্থ মাকড়সা। এই সুরাটির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে একত্ববাদের সুর। এর বহুলাংশে বর্ণিত হয়েছে বিভিন্ন বার্তাবাহকদের একত্ববাদের সংগ্রাম এবং তার বিরোধীদের করুণ পরিণতি। মূলত আল্লাহর একত্ববাদ বিরোধীদের করুণ পরিণতির পাশাপাশি পার্থিব জীবনে তাদের অবস্থা মাকড়সার ঘরের ন্যায়। সুরাটির নামকরণও তাই সার্থক হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা আল্লাহ ছাড়া বহু অভিভাবক গ্রহণ করে, তাদের দৃষ্টান্ত মাকড়সার ন্যায়, যে ঘর বানায়। আর ঘরের মধ্যে মাকড়সার ঘরই তো দুর্বলতম, যদি তারা জানত ।’ (সুরা আনকাবুত, ৪১)। আমরা দেখছি একত্ববাদী আর বহুত্ববাদী দ্বন্দ্ব সব যুগেই বিদ্যমান। আবার আরেকটি গ্রুপ আছে যারা, আল্লাহ বাদে অন্য কোনো রক্ত-মাংসের শরীর কিংবা জড় বস্তুতে নিজেদের উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছে। উপাস্যরূপে যারা আল্লাহকে গ্রহণ করে না তাদের অবস্থা মাকড়সার ঘরের সঙ্গে তুলনীয়।

জন্তু-জানোয়ারের যত প্রকার ঘর বা বাসা বিদিত আছে, তন্মধ্যে মাকড়সার জালই দুর্বলতর। সামান্য বাতাসেও ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। তাই স্বাভাবিকভাবে মনে হতে পারে এ কারণেই আলোচ্য উপমাটি এসেছে। এছাড়া আমরা এখানে দেখতে পারি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে মাকড়সার অ্যানাটমি ও মাকড়সার ঘরের অন্তর্নিহিত কৌশল ও ব্যবহার।

মাকড়সার প্রায় ৪৫ হাজার প্রজাতি রয়েছে। আর্থোপোডা পর্বের আটপা-বিশিষ্ট প্রাণীটির সর্বাধিক স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্য হলো জাল বা ঘর উৎপাদন ক্ষমতা এবং মাকড়সার জালের ফাঁক ছোট বা বড় রাখে কী ধরনের শিকার ধরবে সেই অনুযায়ী। এমনকি পরিবেশের তাপমাত্রার ওপরেও নির্ভর করে জালের ধরন। মধ্যস্থান ছাড়া সম্পূর্ণ জালই আঠালো। জাল বা সুতা তৈরি এ জন্য মাকড়সার পেটের শেষ প্রান্তে তিন জোড়া স্পিনারেট থাকে। এগুলো অত্যন্ত সঞ্চালন ক্ষমতাসম্পন্ন।

স্পিনিং গ্রন্থি থেকে এসব স্পিনারেটের মাধ্যমে রস নিঃসৃত হয়ে সুতা তৈরি হয়। সুবহানাল্লাহ। মাকড়সা জালের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এই জালের সঙ্গে থাকা স্পাইরাল আঠা জালের কয়েক মিলিমিটার দূরত্ব পর্যন্ত পৃথিবীর বিদ্যুৎ বা তড়িৎ ক্ষেত্রকে বিকৃত করে ফেলে। এর ফলে কিছু কীটপতঙ্গ বিভ্রান্ত হয় ও তাদের এন্টেনার ইলেকট্রিক সেন্সর তাদেরকে জালের কাছে নিয়ে আসে। হাইপটিওটস ক্যাভাটাস প্রজাতির এক প্রকার মাকড়সার জাল বোনার গতি একটি রকেটের গতির চেয়েও প্রায় ২৬ গুণ বেশি। সাধারণত মাকড়সা একটি জাল তৈরি করতে সময় নেয় মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিট।

স্কটল্যান্ডের অধিপতি রবাট বরুসের রাজ্য পুনরুদ্ধারের কাহিনী আমরা জানি। শত্রুর হাতে তিনি যখন বারবার পরাজিত হয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন, তখন এক ক্ষুদ্র মাকড়সার বারবার ছিঁড়ে যাওয়া জাল নতুন করে বোনার সফলতা থেকে তিনি পেয়েছিলেন অধ্যবসায়ের শিক্ষা। আবার হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর হিজরতকালে পাহাড়ের এক গুহার মধ্যে আশ্রয় নেন । কিছুক্ষণের মধ্যেই গুহার মুখে মাকড়সা জাল বুনে সে গুহার মুখ বন্ধ করে দেয়। আততায়ীরা দেখতে পায় গুহার প্রবেশপথে মাকড়সার জাল বিস্তৃত হয়ে আছে। তারা এ দেখে নিশ্চিত হয় যে, দু্-একদিনের মধ্যে

হয়তো এ গুহার মধ্যে কেউ প্রবেশ করেনি । আল্লাহর হুকুমে একটা মাকড়সার জাল সেদিন এক মহামানবের প্রাণ বাঁচানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল।

মাকড়সার জালের বৈচিত্র্য, জ্যামিতিক গঠন মানুষকে যুগে যুগে আকৃষ্ট করেছে। তাই তো জনপ্রিয় স্পাইডারম্যান নামক কমিক সিরিজে স্পাইডারওয়ের যেন মুখ্য চরিত্র হয়ে ফুটে উঠেছে। মানুষ প্রকৃতি থেকে প্রতিনিয়ত শিখছে। স্রষ্টা সব প্রাণীকে পরিবেশের সংগ্রাম উপযোগী করেই সৃষ্টি করেন। এখানে দেখা যায় মাকড়সার ঘর/জাল ধ্বংসের যে ক্রিয়া তা মাকড়সার স্বভাবজাত। সাধারণত প্রকৃতির বিরূপ প্রতিক্রিয়া এর ওপর খুব বেশি প্রভাব বিস্তার করে না। দু-তিন দিনের বেশি জালের আঠা ঠিক থাকে না বিধায় তারা মেয়াদোত্তীর্ণ জাল রিসাইকেলিংয়ের অংশ হিসেবে খেয়ে ফেলে। এভাবে তারা নিজের শিকারের প্রয়োজনে ঘর/জাল বুনছে প্রতিনিয়ত আবার সংক্ষিপ্ত সময়ে তা নিজেরা ধ্বংসও করছে।

অতএব, প্রকৃতিগতভাবে মাকড়সার ঘর তার জন্য উপযুক্ত হলেও মাকড়সার জীবনযাপন পদ্ধতির কারণেও সেটি ভঙ্গুর। সেরূপ স্রষ্টা ব্যতীত অন্যের অভিভাবকত্ব গ্রহণ মাকড়সার ঘর/জালের পরিণতি লাভ করে—যে ঘর তার নিজেরই স্থায়িত্বের নিশ্চয়তা দেয় না।

সর্বশেষ সংবাদ