সমাজসেবার উপকারিতা

প্রকাশিত: 11:37 AM, September 3, 2021

সমাজসেবার উপকারিতা

ইসলামিক ডেস্কঃ মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমাজসেবা সীমাহীন গুরুত্বের দাবিদার। সাধারণত সমাজের অসুবিধাগ্রস্ত মানুষের কল্যাণে গৃহীত সেবামূলক কার্যক্রমকে সমাজসেবা বলা হলেও আধুনিক ধারণা মতে, সমাজসেবা হচ্ছে সমাজে মানুষের নিরাপত্তা ও মঙ্গলার্থে গৃহীত যাবতীয় কার্যক্রমের সমষ্টি। একজন অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সান্ত¡নার বাণী শোনালে, খোঁজখবর নিলে, একটু সেবাযতœ করলে তার দুশ্চিন্তা লাঘব হয়। সে অন্তরে অনুভব করবে প্রশান্তি। তাই মানবিক বিচারে রোগীর খোঁজখবর নেওয়া, সেবাযতœ করা উচিত। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবদের কেউ অসুস্থ হলে তার খোঁজখবর নেওয়ার ব্যাপারে অবহেলা করা উচিত নয়। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, দরিদ্র, নিঃস্ব, এতিম, নিরাশ্রয়, রোগী ও বিপদগ্রস্ত মানুষের যথাযথ সেবা সওয়াবের কাজ। এতে অমনোযোগী হওয়া আল্লাহর অসন্তুষ্টির মাধ্যম ও গোনাহের কাজ। সেবামূলক কার্যক্রমে মানুষকে সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ করে ইসলাম। ইসলাম মানুষকে সর্বোচ্চ মানবিকতা, সহমর্মিতা ও মহানুভবতার শিক্ষা দিয়েছে। এ উদ্দেশ্যে আল্লাহতায়ালা তার নবীকে পাঠিয়েছেন দয়া ও সহমর্মিতার প্রতীক হিসেবে। সমাজসেবা হচ্ছে ইসলামি দাওয়াতের ভূমিকা স্বরূপ। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমাজসেবার মাধ্যমে আরবের জন মানুষের হৃদয় ও মন জয় করেছিলেন যা নবুওয়াত প্রাপ্তির পর দাওয়াতি কাজে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল।

নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তঃকরণ ছিল সমবেদনা ও মানবতার সেবায় পরিপূর্ণ। তিনি মানুষের রোগ-ব্যাধি ও নানা বিপদ-আপদের সময় বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে স্পষ্ট আকারে মানুষের সেবা, সহযোগিতা ও সমাজসেবামূলক নানা কাজ করার নির্দেশনা এসেছে। ইসলামের শিক্ষা হলো মানবিক মর্যাদা ও অধিকারে পৃথিবীর সব মানুষ সমান। বিশেষত, অসহায় ও দরিদ্র মানুষদের ইসলাম সমাজের অভিন্ন অংশ মনে করে এবং তাদের দায়িত্ব গ্রহণে অন্যদের উৎসাহিত করে। পবিত্র কোরআনে এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, ‘আত্মীয়-স্বজনকে দাও তার প্রাপ্য এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও এবং কিছুতেই অপব্যয় করো না।’ সুরা বনি ইসরাইল : ২৬

সমাজের অসহায়রা বোঝা নয় বরং রহমত বিশেষ। তাদের প্রতি সদাচরণের মাধ্যমে মুমিনরা সমৃদ্ধি লাভ করেন। হাদিসে বলা হয়েছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের দুর্বলদের কারণে সাহায্য ও জীবিকা লাভ করে থাকো।’ সহিহ্ বোখারি : ২৮৯৬

বর্ণিত হাদিসে দুর্বলদের দ্বারা জীবিকা লাভের ব্যাখ্যায় ইসলামি স্কলাররা বলেছেন, দুর্বলদের মাধ্যমে জীবিকা লাভের কারণ হলো তারা দোয়ায় বেশি একনিষ্ঠ ও ইবাদতে বেশি বিনয়ী। তাদের অন্তর পার্থিব ঝামেলামুক্ত থাকে। অসহায় ও দুর্বলরা পার্থিব জীবনের উপায়-উপকরণ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তারা ভাঙা হৃদয় নিয়ে আল্লাহর দিকে তাকিয়ে থাকে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) সেদিকে ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ এই উম্মতকে সাহায্য করেন তাদের দুর্বলদের দ্বারা তাদের দোয়া, নামাজ ও নিষ্ঠার মাধ্যমে।’ সুনানে নাসায়ি : ৩১৭৮

 

ধনী ও সচ্ছলরা অসহায়দের যে সম্পদ দান করে এর মাধ্যমে তাদের প্রতি অনুকম্পা করা হয় বিষয়টি এমন নয়। এর মাধ্যমে অসহায় মানুষ তার প্রাপ্য লাভ করে, এটা তাদের প্রাপ্য। আল্লাহতায়ালা এটা তাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন। কোরআন মজিদে এ বিষয়ে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা কি তোমার রবের করুণা বণ্টন করে? আমিই তাদের মধ্যে তাদের জীবিকা বণ্টন করি-পার্থিব জীবনে এবং একজনকে অন্যের ওপর মর্যাদায় উন্নত করি, যাতে একে অন্যের দ্বারা কাজ করিয়ে নিতে পারে।’ সুরা জুখরুফ : ৩২

অসহায় মানুষ, পরিবারের সদস্যদের জন্য খরচ করলে আল্লাহতায়ালা তার জীবিকা বাড়িয়ে দেন, মানুষের জন্য খরচ করলে সম্পদ বাড়ে। কোরআনে কারিমে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘বলুন, আমার রব তার বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা জীবিকা বাড়িয়ে দেন এবং যাকে ইচ্ছা সীমিত করেন। তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, তিনি তার প্রতিদান দেবেন। তিনিই শ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা।’ সুরা সাবা : ৩৯

যারা সমাজের অসহায় মানুষের জন্য ব্যয় করে এবং উদার হস্তে খরচ করে আল্লাহর ফেরেশতারা তাদের সমৃদ্ধির জন্য দোয়া করেন। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে ফেরেশতারা দোয়া করে হে আল্লাহ, খরচকারীকে যথোচিত বিনিময় দান করেন আর কৃপণের সম্পদ নষ্ট করে দেন।’ সহিহ্ বোখারি : ১৪৪২

ইসলাম অন্যদের অসহায়ের সাহায্য করার নির্দেশ দিলেও ব্যক্তিকে নিজের অসহায়ত্ব দূর করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘বরং তিনি, যিনি আর্তের আহ্বানে সাড়া দেন, যখন সে তাকে ডাকে এবং বিপদ-আপদ দূর করেন এবং তোমাদের পৃথিবীর প্রতিনিধি করেন। আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্য আছে কি? তোমরা অতি সামান্য উপদেশ গ্রহণ করে থাকো।’সুরা নামল : ৬২

ইসলাম মানুষকে কর্মনিষ্ঠ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ভাগ্যোন্নয়নের চেষ্টা ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজ অবস্থা পরিবর্তনে সচেষ্ট হয়।’ সুরা রাদ : ১১

মানুষের সেবার এই মহৎ ও সুন্দরতম গুণটি যদি মানুষ পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বড়-ছোট, উঁচু-নিচু ভেদাভেদ ভুলে নিঃস্বার্থভাবে হৃদয়ে ধারণ করতে পারে, তবে সমাজ জীবনে ব্যাপক কল্যাণমুখী পরিবর্তন আসবে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শকে সামনে রেখে সবাইকে সমাজসেবামূলক কর্মসূচি চালিয়ে যেতে হবে। বান্দার হক তথা আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিব-দুঃখী মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা এবং আর্তমানবতার সেবা, সামাজিক সমস্যা দূরীকরণ ও সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে হবে।