সিলেট নগরীর অভ্যন্তরের পুকুর-দীঘিসহ জলাশয় সংরক্ষণের উদ্যোগ

প্রকাশিত: 5:05 AM, November 22, 2021

সিলেট নগরীর অভ্যন্তরের পুকুর-দীঘিসহ জলাশয় সংরক্ষণের উদ্যোগ

নিউজ ডেস্কঃ পুকুর-দীঘি ভরাট করে মার্কেট, দোকানপাট, পার্ক ও মসজিদ নির্মাণ করার পর এবার নগরীর অভ্যন্তরের পুকুর-দীঘিসহ সকল জলাশয় সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে সিলেট সিটি কর্পোরেশন। এজন্যে পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতিসহ (বেলা) ৬ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ৩০ দিনের মধ্যে সকল জলাশয়ের তালিকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের নিকট জমা দিতে বলা হয়েছে।

কমিটির আহবায়ক ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আরবান প্লানার মো. তানভীর রহমান মোল্লা এ বিষয়ে বলেন, কমিটিতে বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারাও রয়েছেন। আগামী ২৬ নভেম্বরের মধ্যে কমিটির সকলকে নিয়ে বসব। এরপর আলাপ আলোচনা করে আমরা কাজ শুরু করব। নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যেই তালিকা তৈরি করে জমা দেয়া হবে।

বর্ধিত সীমানার অভ্যন্তরের না পুরাতন সীমানার জলাশয়ের তালিকা তৈরি করা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, কমিটির সদস্যদের সাথে আলোচনার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। বর্ধিত সীমানা করলে অনেক সময় লাগবে। তাই আমরা আপাতত পুরাতন সীমানার অভ্যন্তরের জলাশয়ের তালিকা তৈরি করার কাজ শুরু করব।

কমিটির সদস্য ও সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, গেল ডিসেম্বরে এ বিষয়ে বেলার একটি অনুষ্ঠানে মেয়র জলাশয় সংরক্ষণে উদ্যোগ নেবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। দেরিতে হলেও তিনি কথা রেখেছেন। নগরীর পুকুর-দীঘিসহ সকল জলাশয় সংরক্ষণ করা হল আমাদের মূল লক্ষ্য।

কমিটির আরেক সদস্য ও বেলার সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক এডভোকেট শাহ সাহেদা আক্তার বলেন, সিলেট নগরীর পুকুর-দীঘিসহ জলাশয় সংরক্ষণে উদ্যোগ নেয়ায় এখন এগুলো সংরক্ষণ করা হবে বলে আশা করা যায়। বেলা দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে কাজ করে আসছে। বেলা এ বিষয়ে অনেক কর্মসূচিও পালন করেছে। নগরবাসী অনেক আন্দোলন সংগ্রামও করেছেন। আমরা এগুলো সংরক্ষণে কাজ করে যাব।

সূত্র জানায়, গত ১০ নভেম্বর সিলেট মহানগরীর পুকুর-দীঘিসহ সকল জলাশয়ের তালিকা সংগ্রহে কমিটি গঠন করা হয়। ৬ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটিতে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আরবান প্লানার মো. তানভীর রহমান মোল্লাকে আহবায়ক, পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেটের সহকারী পরিচালক মো. রাসেল নোমান, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক এডভোকেট শাহ সাহেদা আক্তারকে সদস্য এবং সিলেট সিটি কর্পোরেশনের উপ-সহকারি প্রকৌশলী বিজিত চন্দ্র দে-কে সদস্য সচিব করা হয়েছে।

মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত কমিটি গঠনের ওই পত্রে বলা হয়, গত ৩০ ডিসেম্বর সিলেট সিটি কর্পোরেশনের অভ্যন্তরের জলাশয় সংরক্ষণে করণীয় বিষয়ে সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক সিলেট মহানগরীর পুকুর-দীঘিসহ সকল জলাশয়ের তালিকা সংগ্রহে কমিটি গঠন করা হল। ৩০ দিনের মধ্যে সরেজমিনে পরিদর্শন পূর্বক সিলেট মহানগরীর পুকুর-দীঘিসহ সকল জলাশয়ের তালিকা সংগ্রহ করে মেয়রের নিকট জমা প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হয়।

এদিকে, বেলা সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় থেকে গত ২৭ জানুয়ারি সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের নিকট পত্র দেয়া হয়। মহানগরীর পুকুর-দীঘিসহ সকল জলাশয়ের তালিকা সংগ্রহে কমিটি গঠনে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রসঙ্গে ওই পত্রে বলা হয়, ২০২০ সালের ৩০ ডিসেম্বর সিলেট সিটি কর্পোরেশনের অভ্যন্তরে জলাশয় সংরক্ষণে করণীয় বিষয়ে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আনীত সুপারিশের ভিত্তিতে মহানগরীর পুকুর-দীঘিসহ জলাশয়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা সংগ্রহে সিলেট সিটি কর্পোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি, পরিবেশ কর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন বেলার সমন্বয়ক। এরপর চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি বেলার পক্ষ থেকে মহানগরীর পুকুর-দীঘিসহ জলাশয়ের তালিকা সংগ্রহে কমিটি গৃহীত পদক্ষেপ সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে তথ্য অধিকার আইনে আরেকটি চিঠি দেয়া হয়।

জানা গেছে, এক সময় সিলেটকে পুকুর বা দীঘির শহর বলা হতো। নানা নামে ছিলো অনেক দীঘি ।

লালদীঘি ভরাট করে তৎকালীন সিলেট পৌরসভা নির্মাণ করেছিল মিউনিসিপ্যাল মার্কেট। যা বর্তমানে সিটি সুপার মার্কেট হিসেবে পরিচিত। বেকাদীঘি ভরাট করে জালালাবাদ পার্ক গড়ে তুলে সিলেট পৌরসভা। ধোপাদীঘি ভরাট করে গড়ে তোলা হয় বেশ কিছু দোকানপাট। ওই দীঘির একাংশ ভরাট করেই সিটি করপোরেশন পার্ক (ওসমানী শিশু পার্ক) ও মসজিদ নির্মাণ করা হয়। চারাদীঘি ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে মসজিদ। ওই স্থানে একটি স্কুল নির্মাণেরও কথা রয়েছে। উত্তরকাজিটুলায় বিশাল দীঘি ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে বিদ্যুৎ অফিসের ভবন।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মোট জলাভূমির পরিমাণ ১ হাজার ৩৫৬ দশমিক ৩০ একর । এর মধ্যে পুকুর, দীঘি, খালও রয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে কেউ কেউ বলছেন এক সময় সিলেট নগরীর অভ্যন্তরে শতাধিক পুকুর ছিল। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে পুকুর-দীঘির সংখ্যা ২৮টি। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বেলার তথ্য অনুযায়ী এর সংখ্যা ৩৬টি। আর গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী রচিত বাংলাদেশের বিলুপ্ত ‘দীঘি-পুষ্করিণী-জলাশয়’ বইয়ে ৬০টি পুকুর-দীঘির নাম উল্লেখ রয়েছে। তবে এখনো টিকে আছে কয়েকটি দীঘি-ছড়া ও পুকুর।

যেগুলো আপদকালে সিলেট নগরীর মানুষের একমাত্র ভরসা হিসেবে কাজে লাগে। গেল বছরের নভেম্বর মাসে সিলেটের কুমারগাঁও বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগুন লাগার পর এর প্রমাণ পাওয়া যায়। সে সময় টানা ৫৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন নগরীতে মানুষের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছিল টিকে থাকা কয়েকটি পুকুরের পানি।