রকিবুলের ব্যাটে ‘জয় বাংলা’ স্টিকার ছিল যেন বাঙালির হৃদয়ের ভাষা

প্রকাশিত: 1:19 PM, March 22, 2021

রকিবুলের ব্যাটে ‘জয় বাংলা’ স্টিকার ছিল যেন বাঙালির হৃদয়ের ভাষা

স্পোর্টস ডেস্কঃ   এ যুগে ব্যাটে স্টিকার মানেই বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী। ক্রিকেটারদের জন্য মূল্যবান একটা ব্যাপার। ব্যাট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনটা খেলোয়াড়েরা করে দেন নিজেদের ব্যাটে তাদের লোগো লাগিয়ে। এ জন্য তাঁরা গুনে নেন হাজার হাজার ডলার। ব্যাটে স্টিকার এখন খেলোয়াড়দের আয়ের উৎসও। কিন্তু ব্যাটে লাগানো স্টিকার যে একটি দেশের স্বাধিকার আন্দোলনের ‘প্রতীক’ হতে পারে, ৫০ বছর আগে পাকিস্তানিরা সেটি খুব ভালো করেই বুঝেছিল।

১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চের সেই উত্তাল সময়। ঢাকায় খেলতে এসেছিল কমনওয়েলথ একাদশ নামের একটি দল। ইংলিশ ক্রিকেটারদের আধিক্য ছিল সেই দলে, আর ছিলেন অন্যান্য দেশের বেশ কিছু ক্রিকেটার। সাবেক ইংলিশ ক্রিকেটার অ্যালেক স্টুয়ার্টের বাবা মিকি স্টুয়ার্ট ছিলেন সে দলের অধিনায়ক। সে সময়কার পাকিস্তান ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের (পিসিসিবি) নির্বাচিত একাদশের বিপক্ষে তিনটি বেসরকারি টেস্টের একটির ভেন্যু ছিল ঢাকা। ১৯৭১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সেই ম্যাচ ঠাঁই নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে। রকিবুল হাসান নামের ১৮ বছর বয়সী এক বাঙালি ক্রিকেটার সে ম্যাচে নিজের ব্যাটে ‘জয় বাংলা’ লেখা স্টিকার লাগিয়ে পাকিস্তানিদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন বাঙালি জাতির স্বাধীনতার আকুতি। পাকিস্তানিদের সামনে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন কাগজে-কলমে এক দেশ হলেও পশ্চিম আর পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে মানসিক দূরত্বটা।

ম্যাচটিতে রকিবুল পিসিসিবি একাদশের হয়ে খেলেছিলেন একমাত্র বাঙালি ক্রিকেটার হিসেবে। পিসিসিবির স্কোয়াডে অবশ্য আরও তিনজন বাঙালি ছিলেন। একজন সৈয়দ আশরাফুল হক, তানভীর মাজহার তান্না আর অন্যজন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্ত্বেও তাদের ক্ষমতায় যেতে না দেওয়ায় গোটা বাঙালি জাতি তখন ক্ষোভে ফুঁসছে। খেলোয়াড়েরাও এর বাইরে ছিলেন না। তরুণ রকিবুল একাদশে সুযোগ পেয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বাঙালির জাতীয়তাবাদের গরিমাকে সবার সামনে তুলে ধরতে। তিনি সফল হয়েছিলেন।

পিসিসিবি একাদশে রকিবুলের সতীর্থরা ছিলেন পাকিস্তানের সেরা ক্রিকেটাররা। ওই দলে ছিলেন সাঈদ আহমেদ, জহির আব্বাস, ওয়াসিম বারি, সরফরাজ নেওয়াজ, ইন্তিখাব আলম। মুশতাক মোহাম্মদ ছিলেন সে দলের অধিনায়ক। ঢাকা স্টেডিয়ামে সে ম্যাচে ছিল প্রচুর দর্শক। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকলেও মানুষ সেদিন ঠিকই ক্রিকেটের নির্যাস উপভোগ করছিল। ঘরের ছেলে খেলছে বলেই হয়তো উদ্দীপনাটা একটু বেশি ছিল। ম্যাচে রয় ভার্জিনের সেঞ্চুরিতে কমনওয়েলথ একাদশ প্রথম ইনিংসে বড় ধরনের লিড নিয়েছিল। তবে পিসিসিবি ঘুরে দাঁড়িয়েছিল রকিবুলের ওপেনিং সঙ্গী আজমত রানার সেঞ্চুরিতে।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ ছিল সে ম্যাচের অন্তিম দিন। সেদিনই পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান সত্তরের নির্বাচনের গণরায় বানচাল করে দিতে আসন্ন জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করে। রেডিওতে ম্যাচের ধারাভাষ্য শুনতে শুনতে বিশেষ বুলেটিনে এমন সংবাদ শুনে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন ক্রিকেট দর্শকেরা। ঢাকা স্টেডিয়ামের গ্যালারি থেকেই আওয়াজ উঠেছিল প্রতিবাদের। গ্যালারির প্যান্ডেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে দর্শকেরা নেমে পড়েছিল মাঠে। ইয়াহিয়ার ওই ঘোষণার পর আসলে ক্রিকেট-আনন্দের কোনো জায়গা ছিল না দর্শকদের মনে। তারাই পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের ধাওয়া করে জানিয়ে দিয়েছিলেন, বাঙালিদের মনে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আর কোনোই জায়গা নেই।

রকিবুলের গল্পটা ম্যাচের আগের দিন রাত থেকেই শুরু। দলের ম্যানেজার মি. ইরতেজা হোটেল পূর্বাণীতে রকিবুলের ৭০৭ নম্বর রুমে এসে সুখবরটা জানিয়ে দেন, ‘রকিবুল, কাল তুমি খেলছ। আজমত রানার সঙ্গে তুমি ওপেন করবে দলের ইনিংসে।’ সুখবরের সঙ্গে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের ব্লেজারও পেলেন তিনি। সঙ্গে আনকোরা নতুন একটা ব্যাট। প্যাড, গ্লাভস। উত্তেজিত রকিবুল। স্বপ্ন সত্যি হতে যাচ্ছে। নতুন গান অ্যান্ড মুর ব্যাটটা হাতে পেয়েই রকিবুলের মাথায় খেলে যায় বুদ্ধিটা—এই ব্যাটে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান লেখা স্টিকার লাগিয়ে মাঠে নামলে কেমন হয়! বাঙালি জাতির স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলনের ঝাঁজ যে এসে লেগেছে তাঁর শরীরেও। তিনিও যে অপেক্ষায় আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন, শেষ হবে বৈষম্যের কালের। প্রতিষ্ঠিত হবে পাকিস্তানে বাঙালি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পাঠান, বালুচ—সব জাতিগোষ্ঠীর।

রকিবুল সেই রাতের কথা কোনো দিনই ভুলতে পারবেন না, ‘আমি সুযোগ পেয়েছি শুনে আমার সঙ্গে হোটেল পূর্বাণীতে দেখা করতে এসেছিলেন মরহুম শেখ কামাল। সঙ্গে মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন। কামাল ভাই রুমে ঢুকেই আমাকে অভিনন্দিত করলেন। এরপর শুরু হলো আড্ডা। একপর্যায়ে আমি তাঁকে আমার পরিকল্পনার কথা জানাই। তিনি খুব উৎসাহী হয়ে উঠলেন। জালালকে পাঠালেন আওয়ামী লীগ অফিসে স্টিকার নিয়ে আসতে। সে সময় আওয়ামী লীগ জয় বাংলা স্লোগান লেখা গাড়িতে লাগানো স্টিকার প্রকাশ করেছিল। খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। অনেকেই গাড়িতে সেই স্টিকার লাগিয়ে ঘুরত। আসলে জয় বাংলা তো আমাদের জাতীয় গর্বের স্লোগান। সবাই ওটা গাড়িতে লাগিয়ে গর্ববোধ করত। জালাল স্টিকার নিয়ে এলে কামাল ভাই নিজ হাতে সেই স্টিকার আমার ব্যাটে লাগিয়ে দেন। ব্যাটে স্টিকার লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে কেমন যেন শিহরণ খেলে গেল আমার মধ্যে।’

ম্যাচে ভালো করতে পারেননি রকিবুল। ওপেনিংয়ে নেমে দুই ইনিংসেই এক রানের বেশি করতে পারেননি। কিন্তু রকিবুলের মাথায় সেদিন খেলা ছিল না। তিনি ‘জয় বাংলা’ লেখা স্টিকার নিয়ে একটা বিদেশি দলের বিপক্ষে খেলতে নেমেছেন, এটা নিয়ে তিনি ছিলেন আপ্লুত, ‘ওই ম্যাচে ভালো করিনি। কেন পারিনি, সেটা নিয়ে কোনো অজুহাত নেই। তবে সত্যি কথাটা হচ্ছে, মাথায় তখন খেলাই ছিল না। আমরা সবাই দেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলাম। ভেতরে-ভেতরে টগবগ করে ফুটছি। আমি সেদিন “জয় বাংলা” স্টিকার নিয়ে খেলতে নেমে উদ্বেলিত ছিলাম।’

পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা কীভাবে নিয়েছিলেন রকিবুলের ব্যাটের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান? বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক ক্রিকেটারের স্মৃতি বলছে, তাঁরা সবাই খুব স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলেন ব্যাপারটা, ‘জহির আব্বাস, মুশতাক মোহাম্মদ, ওয়াসিম বারি জানতে চেয়েছিল, “তোমার ব্যাটে বাংলায় কী লেখা।” আমি বলার পর এটা নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল খুবই স্বাভাবিক। তারা বরং উল্টো রসিকতা করেছিল ইয়াহিয়া খানকে নিয়ে। বেশ খানিকটা উৎসাহও পেয়েছিলাম তাদের কাছ থেকে।’

দলের ম্যানেজার মি. ইরতেজার প্রশ্নবাণ থেকে অবশ্য রেহাই পাননি রকিবুল, ‘মনে আছে ম্যাচের প্রথম দিন লাঞ্চের সময় আমি ড্রেসিংরুমের একটা চেয়ারে বসে স্যুপ খাচ্ছি। ইরতেজা সাহেব আমার কাছে এসে একটা চেয়ার টেনে বসলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “রকিবুল, তোমার ব্যাটে বাংলায় কিছু একটা লেখা। তুমি কি আমাকে বলবে এটা কী লেখা?” আমি সহজভাবেই উত্তর দিয়েছিলাম, “জয় বাংলা”। তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “জয় বাংলা কথাটার মানে কী?” আমি বললাম, এটা দিয়ে বাংলার বিজয় কামনা করি আমরা। তিনি বললেন, “এটা কি তোমার লাগানো ঠিক হয়েছে? তুমি কিন্তু এ মুহূর্তে গোটা পাকিস্তানকে প্রতিনিধিত্ব করছ। আমরা সবাই পাকিস্তানি। আলাদা করে বাংলার বিজয় কামনা করাটা কেমন একটা ব্যাপার হয়ে গেল না!” আমি চুপ করে রইলাম। তিনি উঠে চলে যান।’

তবে দলের ম্যানেজার এটা নিয়ে আর কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। রকিবুলের সঙ্গে আচরণও তাঁর খুবই স্বাভাবিক ছিল, ‘ম্যানেজার ইরতেজা সাহেব ভদ্রলোক ছিলেন। তিনি এ নিয়ে আর কোনো টুঁ শব্দই করেনি। তবে আমার পশ্চিম পাকিস্তানি সতীর্থেরা ব্যাপারটি খুব উপভোগ করছিল। আসলে তারাও ইয়াহিয়া খান ও সেনাবাহিনীর আচরণে ক্ষুব্ধ ছিল।’

ইয়াহিয়া খানের সেই বেতার ঘোষণার পর ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়ে যায়। সে মুহূর্তের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি রকিবুলকে অবাক করেনি, ‘আসলে ওই ঘোষণার মধ্য দিয়েই ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রের বিদায়ঘণ্টা বেজে যায়। খেলাটা হয়ে পড়ে খুব গৌণ বিষয়। স্টেডিয়ামের প্যান্ডেলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল দর্শকেরা। সেখান থেকেই মিছিল বের হয়। হাজার হাজার মানুষ হোটেল পূর্বাণীর দিকে স্লোগান দিয়ে হাঁটতে থাকে। ঠিক ওই সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্বাণীতে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের একটা সভা করছিলেন। জনতা পূর্বাণীর দিকে গিয়েছিল ইয়াহিয়ার ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধুর প্রতিক্রিয়া জানতে। পরবর্তী কর্মসূচি সম্পর্কে অবগত হতে।’

ম্যাচ পণ্ড হয়ে যাওয়ার পর দুই দলকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে। কিন্তু রকিবুলসহ বাঙালি ক্রিকেটাররা ক্যান্টনমেন্টে যেতে চাননি। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেই। তাঁদের শঙ্কা ছিল এমন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ডেরায় যাওয়াটা বাঙালি হিসেবে নিরাপদ নয়, ‘আমরা বাঙালি ক্রিকেটাররা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করলাম। তান্না বলেছিলেন, “ক্যান্টনমেন্টে যাওয়া যাবে না। ওখানে গেলে আমাদের গ্রেপ্তার করে ফেলতে পারে।” আমরা নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বোঝালাম, আমরা হোটেলেই নিরাপদ। সবারই বাসা যেহেতু ঢাকায়, তাই পরিস্থিতি খারাপ হলে বাসায় চলে যেতে পারব।’ ব্যাপারটি ভালোভাবে নেয়নি নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারা। তারা আমাদের কাছে মুচলেকা দাবি করলেন। কোনো ক্ষতি হলে তারা দায়ী থাকবেন না, ‘আমাদের মুচলেকা দিতে হলো। সেটিই দিলাম। আসলে আমরা কেউই ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে যেতে চাইছিলাম না।’

সন্ধ্যা পর্যন্ত রকিবুল, জুয়েল, তান্না, আশরাফুল হকরা পূর্বাণীতেই অবস্থান করেছিলেন। সংঘাতময় পরিস্থিতি শান্ত হয়ে গেলে দুই দলের ক্রিকেটাররা আবারও পূর্বাণীতে ফেরত আসেন। সে মুহূর্তে সবাইকে চরম আতঙ্কগ্রস্ত দেখাচ্ছিল, এটা রকিবুলের মনে আছে, ‘পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। মুশতাক মোহাম্মদ, ইন্তিখাব আলম, জহির আব্বাস—কেউই পাঞ্জাবি ছিলেন না। বাঙালিদের প্রতি কিছুটা হলেও মমত্ববোধ কাজ করত তাঁদের মধ্যে। তাঁরা বিদায় নিলেন আমাদের কাছ থেকে। জহির আব্বাস আমাকে বলেছিলেন, “আবার কবে দেখা হবে?” আমার উত্তর ছিল, “জানি না।” তিনি কোনো কথা না বলে আমার দুই হাত ধরে উল্টো দিকে ঘুরে চলে যান।’