মৃত্যুর অনিবার্যতা

প্রকাশিত: 12:49 PM, September 4, 2021

মৃত্যুর অনিবার্যতা

ইসলামিক ডেস্কঃ মৃত্যু অনিবার্য। এটি চির সত্য ও সর্বজন স্বীকৃত কথা। ধর্ম, মতবাদ দৃষ্টিভঙ্গি যার যাই হোক না কেন, এক জায়গায় সবাই একমত, সেটা হলো নিশ্চিত মৃত্যু। মৃত্যুর মাধ্যমেই দুনিয়ায় জীবনের সমাপনী আসে এবং আখেরাতের অনন্ত জীবনের সূচনা হয়। যে যেখানেই থাকুক না কেন মৃত্যু পাকড়াও করবেই। মৃত্যু থেকে পলায়নের কারও সাধ্য নেই। এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, মৃত্যু কিন্তু তোমাদের পাকড়াও করবেই। যদি তোমরা সুদৃঢ় দুর্গের ভেতরেও অবস্থান করো, তবুও।’ সুরা আন নিসা : ৭৮
কোরআনে কারিমে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা যে মৃত্যু থেকে পলায়নপর, সেই মৃত্যু অবশ্যই তোমাদের মুখোমুখি হবে, অতঃপর তোমরা অদৃশ্য-দৃশ্যের জ্ঞানী আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে। তিনি তোমাদের জানিয়ে দেবেন সেসব কর্ম, যা তোমরা করতে।’ সুরা আল জুমুআ : ৮

মৃত্যু যখন আসবে তখন রুহু কবজের পর থেকে কয়েকটি ধাপ মানুষকে ভোগ করতে হবে। এসব ধাপের প্রতিটি মুহূর্তে রয়েছে মানবজীবনের জন্য শিক্ষা। মৃত্যুর দিন, রুহু কবজ করার মুহূর্ত, অবস্থা, মৃত্যুকালে মানুষের কষ্টের মতো বিষয়গুলো নানাভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ওই সব বর্ণনার মূল বিষয় হলো মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের জীবনের সমাপ্তি ঘটবে, হায়াত ফুরিয়ে যাবে। আল্লাহ ফেরেশতাদের নির্দেশ দেবেন জমিনে গিয়ে রুহু কবজ করে নিয়ে আসতে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই দিন সম্পর্কে কেউ জানে না। এমনকি যখন দিনটি উপস্থিত হবে সেদিনও মানুষ জানবে না আজ তার মৃত্যুর দিন। মৃত্যুর বিষয়টি উপলব্ধি না করা সত্ত্বেও দেহে কিছু পরিবর্তন অনুভব করবে। মুমিনের অন্তরে প্রশান্তি অনুভূত হবে আর পাপিষ্ঠ বুকে খুব চাপ অনুভব করবে। এই স্তরে শয়তান এবং দুষ্ট জিন ফেরেশতাদের নামতে দেখবে। কিন্তু মানুষ তাদের দেখবে না। এই পদক্ষেপটি কোরআনে কারিমে বর্ণিত হয়েছে এভাবে, ‘তোমরা সেই দিনকে ভয় করো যেদিন তোমাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে আল্লাহর কাছে। অতঃপর প্রতিটি নফসকে পরিপূর্ণভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হবে তার কর্মফল।’ সুরা বাকারা : ২৮১

মৃত্যুর ফেরেশতারা রুহু কবজ করবেন। এর মাধ্যমে মানুষের জীবন চাকা থেমে যাবে। রুহু কবজের সময় মানুষ ক্লান্তি ও অস্থিরতা অনুভব করেন এবং একধরনের অসহনীয় চাপ অনুভব করেন। তখনো তিনি জানতে পারেন না যে তার রুহু বের হয়ে যাচ্ছে। তবে যারা মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করে পরকালের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে, তারা সেভাবে কষ্ট অনুভব করেন না। মৃত্যুকালীন কষ্ট নিয়ে কোরআন-হাদিসে বিশদ বিবরণ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মানুষের রুহু কবজের সময়টা জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত। কেননা তখন সে আল্লাহর সব প্রতিশ্রুতি ও ভীতি দেখতে পায়। ফেরেশতাদের দেখতে পায়। জীবনে যত আমল করেছে তা চোখের সামনে ভাসতে থাকে। আর এই অবস্থায় মৃত্যুর ফেতনা ঘটে যায়। শয়তান এই ফেতনায় প্রবেশ করে এবং আকিদায় সন্দেহ সৃষ্টি করতে থাকে। আল্লাহর ব্যাপারে, নবীর ব্যাপারে, দ্বীনের ব্যাপারে ও কোরআনের ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টি করতে থাকে তার অন্তরে। শয়তান তার সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করতে থাকে যেন সে কাফের হয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়। এ জন্য কোরআনে কারিমে মানুষকে লক্ষ্য করে মৃত্যুর ফেতনা থেকে আল্লাহর আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনি বলুন, হে আমার রব! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি শয়তানের প্ররোচনা থেকে। আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি তাদের উপস্থিতি থেকে।’ সুরা মুমিন : ৯৭-৯৮

 

মৃত্যুর সময়ই মানুষ অনুধাবন করতে পারে, সে জান্নাতি না জাহান্নামি। সে তার আমলের ফলাফল দেখবে এবং তার পরিণতি সম্পর্কে জানতে পারবেন মর্মে হাদিসে বর্ণনা রয়েছে। বিশেষভাবে যারা বিভিন্ন গোনাহে লিপ্ত ছিল এবং তওবা না করে পাপ নিয়ে আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হয়। এ মর্মে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘শপথ সেই ফেরেশতাদের যারা নির্মমভাবে (রুহু) টেনে বের করে।’ সুরা নাজিয়াত

জাহান্নামের একদল ফেরেশতা থাকবে যারা আগুনের কাফন প্রস্তুত করে এবং খুব নির্দয়ভাবে পাপী ব্যক্তির রুহু কবজ করে। কোরআনের অন্যত্র এই কঠিন পরিস্থিতির চিত্র বর্ণিত হয়েছে এভাবে, ‘ফেরেশতারা যখন তাদের মুখমণ্ডল এবং পৃষ্ঠদেশে আঘাত করতে করতে তাদের প্রাণ হরণ করবে তখন তাদের কী দশা হবে?’ সুরা মুহাম্মদ

কোনো মুমিন বান্দা যখন দুনিয়া ত্যাগ করে আখেরাতে পাড়ি জমানোর (মৃত্যুর) সময় উপস্থিত হয়; তখন আসমান থেকে সাদা চেহারাবিশিষ্ট ফেরেশতারা নিচে নেমে আসেন। তাদের সঙ্গে থাকে বেহেশতের কাফন ও আতর। তারা তার (মৃত ব্যক্তির) চোখের সীমানায় এবং মৃত্যুর ফেরেশতা (মৃত ব্যক্তির) মাথার কাছে বসেন। তিনি (মৃত্যুর ফেরেশতা) বলেন, ‘হে পবিত্র ও নেক আত্মা! তুমি আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টির দিকে বেরিয়ে আস। তখন আত্মা বেরিয়ে আসে, যেভাবে কলসি থেকে পানির ফোঁটা বেরিয়ে আসে। তখন ফেরেশতারা আত্মাকে আতরযুক্ত কাফনে রাখেন, সেই কাফন থেকে পৃথিবীর সর্বোত্তম সুঘ্রাণ বের হতে থাকবে। তারপর তারা ওই রুহু নিয়ে ওপরে যাবেন। তারা যখন কোনো ফেরেশতা দলের কাছ দিয়ে অতিক্রম করবেন, তখন ফেরেশতারা বলবে, এটি একটি উত্তম আত্মা।

বান্দা যদি পাপিষ্ঠ হয়, তখন হজরত আজরাঈল (আ.) তাকে বলবে, হে নিকৃষ্ট আত্মা! আগুন ও জাহান্নামের এবং ক্রোধান্বিত ও প্রতিশোধপরায়ণ রবের উদ্দেশ্যে বের হয়ে এসো। তখন তার অভ্যন্তরীণ চেহারা কালো হয়ে যাবে এবং চিৎকার করে বলবে, ‘হে আমার রব! আমাকে পুনরায় (দুনিয়ায়) পাঠান যাতে আমি সৎকাজ করি যা আমি পূর্বে করিনি।’ সুরা মুমিন

কিন্তু তাকে আর সেই সুযোগ দেওয়া হবে না। কোরআনে কারিমে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর কিয়ামতের দিন তোমাদের পরিপূর্ণ বদলা দেওয়া হবে। তারপর যাকে দোজখ থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ধোঁকা বৈ আর কিছু নয়।’ সুরা আলে ইমরান : ১৮৫

সুতরাং সর্বাবস্থায় আমাদের উচিত, মৃত্যুকে স্মরণ করা। মৃত্যু যেন সহজ হয়, সেভাবে আমল ও ইবাদত-বন্দেগি করা। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনি (একমাত্র আল্লাহ) জীবন দান করেন এবং তিনিই মৃত্যু ঘটান। আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো অভিভাবক নেই, কোনো সাহায্যকারীও নেই।’ সুরা তাওবা : ১১৬