ডাউনপেমেন্ট ছাড়া ঋণ পুনঃতফসিল চান ব্যাংক মালিকরা

প্রকাশিত: 12:46 PM, February 7, 2021

ডাউনপেমেন্ট ছাড়া ঋণ পুনঃতফসিল চান ব্যাংক মালিকরা

অর্থিনীতি ডেস্কঃ  ব্যবসায়ীদের ঋণ পরিশোধে বাড়তি সুবিধা চায় ব্যাংক মালিকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। ১ টাকাও ডাউনপেমেন্ট না দিয়ে সব চলমান ঋণ তিন বছর মেয়াদে পুনঃতফসিলের সুযোগ চান তারা। আর বিদ্যমান মেয়াদি ঋণ পরিশোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাড়তি যে দুই বছর সময় দিয়েছে, তা তিন বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর চিঠি দিয়ে এমন দাবি জানানো হয়েছে।

গত ৩১ জানুয়ারি এক সার্কুলারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ঋণ পরিশোধ না করেও খেলাপিমুক্ত থাকার সুবিধা আর বাড়ানো হবে না। তবে ব্যবসায়ীদের কিস্তির পরিমাণের চাপ কমাতে মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে অবশিষ্ট মেয়াদের ৫০ শতাংশ অথবা দুই বছরের মধ্যে যেটি কম, সে পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আর চলমান ঋণ ও প্রণোদনার আওতায় বিতরণ করা ঋণ পরিশোধের বিদ্যমান নীতিমালা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। এই সার্কুলারের সংশোধন দাবি করেছে বিএবি।

বিএবির চিঠিতে বলা হয়েছে, মোট ঋণের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ চলমান বা তলবি ঋণ। অথচ এই বিষয়ে গত ৩১ জানুয়ারির সার্কুলারে কিছু বলা হয়নি। ফলে করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান চলমান ঋণ পরিশোধের যে অতিরিক্ত সময় পেয়েছে, তা এখন একবারে পরিশোধ করতে হবে। কেউ না করলে ২০২১ সালের ১ জানুয়ারিই মেয়াদোত্তীর্ণ বা খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হবে। বিদ্যমান অবস্থায় অধিকাংশ ব্যবসায়ীই এক বছরে জমে থাকা সুদ-মুনাফা পরিশোধে ব্যর্থ হলে তারা খেলাপি হয়ে পড়বেন। ব্যবসা চালানোর জন্য ব্যাংক ঋণের সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার সক্ষমতা হারাবেন। এ রকম পরিস্থিতিতে দেশের ব্যবসার ক্ষেত্রে অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে। সুতরাং ওই চলমান ঋণ পরিশোধযোগ্য অংশ শূন্য ডাউনপেমেন্টের মাধ্যমে মেয়াদি ঋণ হিসেবে নূ্যনতম তিন বছর পুনঃতফসিলের মাধ্যমে পরিশোধের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মেয়াদি ঋণের অবশিষ্ট মেয়াদ দুই বছরের পরিবর্তে তিন বছর পর্যন্ত বাড়ানোর দাবি জানিয়ে চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, যেসব ঋণের অবশিষ্ট মেয়াদ খুবই কম, তাদের ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ে বিরাট অঙ্কের ঋণ পরিশোধ করা দুস্কর হবে। ফলে ব্যাপক অংশ অনিচ্ছাকৃত খেলাপিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ রকম অবস্থায় নূ্যনতম আরও তিন বছর পর্যন্ত বাড়ানোর দাবি করা হয়েছে।

জানতে চাইলে বিএবির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার  বলেন, মোট ঋণের বড় অংশই চলমান ঋণ। বিপুল পরিমাণের ঋণ একবারে পরিশোধ করতে গেলে বাড়তি চাপ তৈরি হবে। তখন ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বাড়বে। যে কারণে এমন দাবি করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে কিস্তি পরিশোধের চাপ কমাতে মেয়াদি ঋণের দুই বছর পর্যন্ত সময় বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আর চলমান বা তলবি ঋণ সহজে খেলাপি হয় না। কেননা, এক বছরের মধ্যে পরিশোধের সময় থাকলেও তা প্রতি বছর নবায়ন করা যায়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কেউ ১০ কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণসীমা অনুমোদিত আছে। এখন সুদসহ বছর শেষে তার ঋণ স্থিতি ১১ কোটি টাকা হলো। তখন তিনি আবেদন করে ঋণসীমা বাড়িয়ে নিতে পারেন। আবার শুধু এক কোটি টাকা পরিশোধ করে নতুন করে নবায়ন করতে পারেন। সুতরাং সব চলমান ঋণ তিন বছরের জন্য পুনঃতফসিলের দাবি অযৌক্তিক। ঢালাওভাবে এমন সুযোগ দিলে নগদ প্রবাহ কমে ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়ে সমস্যায় পড়বে।

অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় ২০২০ সালে ঋণ পরিশোধ না করেও খেলাপিমুক্ত থাকার সুযোগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই সময় যারা ঋণ শোধ করেননি, স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমপরিমাণ মেয়াদ বেড়ে গেছে। মেয়াদি বা চলমান সব ঋণগ্রহীতাই বাড়তি সময় পাচ্ছেন। ফলে ২০২০ সালে অপরিশোধিত ঋণ একবারে পরিশোধ না করলে তিনি খেলাপি হবেন এটা ঠিক না। এ ছাড়া ব্যবসায়ীদের কিস্তির পরিমাণের চাপ কমাতে মেয়াদি ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে অবশিষ্ট মেয়াদের ৫০ শতাংশ অথবা দুই বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে করে কোনো ঋণের মেয়াদ যদি পাঁচ বছর বাকি থাকে, তিনি ওই ঋণ পরিশোধে সাত বছর সময় পাবেন। এতে করে কিস্তির পরিমাণ অনেক কমে আসবে।

বিএবির দাবির বিষয়ে কোনো ব্যাংকার নাম উল্লেখ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে দু’জন এমডি  বলেছেন, কোনো ব্যবসায়ী প্রকৃত সমস্যার কারণে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে কেস টু কেস ভিত্তিতে ব্যাংকগুলো সব সময়ই বাড়তি সুবিধা দেয়। তবে ঢালাও কোনো সুবিধা দিলে সুযোগসন্ধানীরা এর অপব্যবহার করেন। করোনার কারণে ২০২০ সালে ঋণ পরিশোধ না করলেও খেলাপি করা যাবে না- ঢালাও এই সুবিধার কারণে সক্ষম বহু ব্যবসায়ী টাকা দেননি। ব্যাংকগুলো তাদের ঋণ আদায় নিয়ে খারাপ অবস্থায় পড়েছে। এখন আবার নতুন করে এ রকম সুবিধা দেওয়া হলে ব্যাংক খাত ব্যাপক চাপে পড়বে। যে কারণে ঢালাওভাবে আর কোনো সুবিধা দেওয়া ঠিক হবে না। এমনটি করা হলে টাকা আর ব্যাংকে আসবে না। অন্য ব্যবসায় চলে যাবে।

২০২০ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ সুবিধার প্রশংসা করে বিএবির চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, দেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখনও করোনার ভয়াবহ প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আগের মতো না হলেও সংক্রমণ একেবারে শেষ হয়নি। বর্তমানে অধিকাংশ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান গড়পড়তা ৫০ শতাংশ বা তারও নিচের সক্ষমতায় চলছে। করোনার নেতিবাচক প্রভাবে ভোগ্যপণ্যের স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক চাহিদা ব্যাপকভাবে কমেছে। এতে ট্রেডিং তথা ব্যবসা খাতের প্রতিষ্ঠানের গড় বিক্রিতে ভীষণ প্রভাব ফেলেছে। ফলে তাদের দৈনন্দিন ব্যবসায়িক খরচ মিটিয়ে মুনাফা পর্যায়ে যাওয়া দুস্কর হয়ে পড়েছে। তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানের ক্রয়াদেশ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ইউরোপ-আমেরিকায় করোনার প্রকোপে সব রিটেইল বিক্রয় এ মুহূর্তে নিম্নগামী থাকায় এমন হয়েছে। এ রকম অবস্থায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো চালু রেখে আমরা যেন বিদ্যমান ঋণখেলাপি হওয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে মুক্ত রাখতে পারি সেজন্য এই দুটি বিষয় বিবেচনার অনুরোধ করা হয়েছে। গত ৩১ জানুয়ারির সার্কুলার সংশোধন চাওয়া হয়েছে।