অর্থে-দাপটে ফুলে ফেপে ওঠা ‘জাহাঙ্গীরদের’ জন্য বার্তা

প্রকাশিত: 4:56 AM, November 22, 2021

অর্থে-দাপটে ফুলে ফেপে ওঠা ‘জাহাঙ্গীরদের’ জন্য বার্তা

নিউজ ডেস্কঃ গাজীপুর সিটি মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে দল থেকে আজীবনের জন্য বহিস্কারের ঘটনাকে একটি বড় ধরনের বার্তা হিসেবে দেখছেন দলটির নেতাকর্মীরা। পরপর তিন মেয়াদে দল ক্ষমতায় থাকার সুবাধে নানা অনিয়ম-অপকর্মের মাধ্যমে অর্জিত বিপুল অর্থ আর দাপটে ফুলে ফেপে ওঠা জাহাঙ্গীরের মতো সবার জন্য জন্য এটিকে একটি বার্তা হিসেবে দেখছেন তারা।

বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কটূক্তির দায়ে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমকে শুক্রবার দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। সাংগঠনিক শাস্তির পাশাপাশি তার মেয়র পদ থেকে সরানোর প্রক্রিয়াও খোঁজা হচ্ছে। আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উঠেছে। আওয়ামী লীগ সাত জন কেন্দ্রীয় নেতা ও তৃণমূলের ১০ জন নেতা-কর্মীর মতে, জাহাঙ্গীরের বহিষ্কার একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে ৭০ বছরের বেশি বয়সী দলটির অন্দরে। এই বহিষ্কারের মাধ্যমে আসলে কিছু বার্তা দেওয়া হয়েছে, যা এই মুহূর্তে খুব প্রয়োজন ছিল। কারণ দলটি একটানা ক্ষমতায় আছে প্রায় এক যুগ ধরে। দলের শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শুধু যে বঙ্গবন্ধু নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জন্যই এই বহিষ্কার, তা নয়। এর পেছনে আরও কিছু কারণও আছে। যারা শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত এবং যাদের কারণে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে তাদের জন্যও বার্তা একটি বার্তা। মন্ত্রি-এমপি এমনকি যত বড় নেতাই হোক না কেন দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থি কর্মকান্ডে লিপ্ত হলে রেহাই নেই।

শুক্রবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জাহাঙ্গীরের বিষয়টি উত্থাপন করলে শুরুতেই বক্তব্য রাখেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তিনি বলেন, জাহাঙ্গীরকে কী ভাষায় শোকজ দেওয়া হয়েছে এবং উত্তর কী এসেছে আমরা জানতে চাই। পরে ওবায়দুল কাদের তা পড়ে শোনান। এরপর নাছিম বলেন, ‘জাহাঙ্গীর অমার্জনীয় অপরাধ করেছে। এই কুলাঙ্গারের আওয়ামী লীগ করার অধিকার নেই।’

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস বলেন, ‘জাহাঙ্গীর তার অপরাধের কথা স্বীকার করেনি। তার বক্তব্য জাতির অস্তিত্বে আঘাত হেনেছে। এটা রাষ্ট্রদ্রোহ। তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে।’ আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ বলেন, ‘জাহাঙ্গীর আমাদের অস্তিত্বে আঘাত হেনেছে। এখানে বিএনপি-জামাতও আঘাত করার সাহস দেখায়নি। তার আওয়ামী লীগে থাকার অধিকার নেই।’ জাহাঙ্গীরের সর্বোচ্চ শাস্তি চান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনিও।

বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের মহান স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে বিতর্কিত করতে বিএনপি-জামাত যে সুরে কথা বলে জাহাঙ্গীরও সেই সুরে কথা বলেছে। তার শাস্তি নিশ্চিত করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।’ দলের প্রেসিডিয়াম সদস শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, ‘তাকে শুধু দল থেকে বহিষ্কার নয়, মামলা করতে হব, মেয়র পদ থেকে বরখাস্ত করতে হবে।’

স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা রোকেয়া সুলতানা বলেন, ‘এই অবমামনানা কোনোভাবেই সহ্য করার মতো নয়।’ বৈঠকের ৩৬ জন নেতাই জাহাঙ্গীরকে দল থেকে বহিষ্কারের পাশাপাশি আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে মেয়র পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।

এ সময় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে বলেন, ‘জাহাঙ্গীর অমার্জনীয় অপরাধ করেছে। ভবিষ্যতে এমন ধৃষ্টতা যাতে কেউ দেখাতে না পারে-জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থাই নেওয়া হবে।’ এ সময় তাকে আওয়ামী লীগ থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কারের ঘোষণা করেন শেখ হাসিনা।

জাহাঙ্গীরকে মেয়র পদ থেকে কীভাবে তাকে অব্যাহতি দেওয়া যায় সেই ব্যাপারে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী কথা বলবেন বলেও জানিয়েছেন নেতাদের।

জাহাঙ্গীরের উত্থান যেভাবে

মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের দাদার বাড়ি নেয়াখালী, নানাবাড়ি গাজীপুর। বাবা মিজানুর রহমান বিয়ের সূত্রে গাজীপুরের কানাইয়া গ্রামে বসবাস শুরু করেছিলেন। কৃষক মিজানুরের অভাবের সংসারে ১৯৭৯ সালে জন্ম জাহাঙ্গীরের। স্থানীয় চান্দনা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাসের পর ভর্তি হন ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজে। অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে পরে মামা শফিকুল আলম তাকে নিজের কাজের সঙ্গে যুক্ত করেন। শফিকুল ছিলেন বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টুর ইসলামপুরের বাগানবাড়ির কেয়ারটেকার।

১৯৯০-৯১ সালের দিকে মিন্টু গাজীপুরে প্রচুর জমিজমা কেনার দায়িত্ব দেন শফিকুলকে। পরে তিনি এর সঙ্গে ভাগ্নে জাহাঙ্গীরকে যুক্ত করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় এক কারখানা মালিকের জমি কেনার অনেক পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছিলেন জাহাঙ্গীর। এরপর তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ধীরে ধীরে রাজনীতিতে জড়িয়ে এবং ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে ভাগ্যের চাকা দ্রুত ঘোরাতে থাকেন। ভিভিআইপিদের আদলে তার গাড়িবহরের পেছনে সব সময় থাকত অ্যাম্বুলেন্স। জাহাঙ্গীরের অর্থ আয়ের একটি বড় খাত হলো গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এলাকায় বিভিন্ন গার্মেন্টের ঝুট ও সুতার কারবার।

একসময় তিনি নিজে এসব দেখভাল করতেন। এখন বিশ্বস্ত সহযোগীদের দিয়ে করান। গত সেপ্টেম্বরে গোপনে ধারণ করা মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের কথোপকথনের একটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়। সেখানে বঙ্গবন্ধু ও জেলার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে। এ পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩ অক্টোবর দলের স্বার্থ পরিপন্থি কর্মকার আলমকে শোকজ করে আওয়ামী লীগ। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ১৫ দিনের মধ্যে জাহাঙ্গীরকে এর জবাব দিতে বলা হয়। যথা সময়ের আগেই শোকজের জবাব দিয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চান তিনি। তবে সাংগঠনিক দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তাকে দল থেকে আজীবন বহিস্কার করা হয়।