অবহিতকরণ সভায় বিশেষজ্ঞদের অভিমত মাটির প্রকৃতির কারণে সিলেটে ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি স্বাভাবিকের চেয়ে ২ থেকে ৭ গুণ বেশী হবে

প্রকাশিত: 9:30 AM, June 18, 2021

অবহিতকরণ সভায় বিশেষজ্ঞদের অভিমত মাটির প্রকৃতির কারণে সিলেটে ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি স্বাভাবিকের চেয়ে ২ থেকে ৭ গুণ বেশী হবে

নিউজ ডেস্কঃ

ভুল ও অনুমোদনহীন নকশায় কোন ভবন নির্মাণ করতে দেয়া যাবে না ॥ ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী

বাংলাদেশের মধ্যে ভূমিকম্পের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল সিলেট। ভূ-গর্ভস্থ ইন্ডিয়ান প্লেট উত্তরপূর্ব দিকে ইউরেশিয়ান প্লেটের বাউন্ডারিতে প্রতিনিয়ত ধাক্কা দিচ্ছে। সিলেট দুই প্লেটের বাউন্ডারির ধাক্কাস্থলে অবস্থিত। ফলে যেকোন সময় সিলেটে বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার আশংকা প্রবল।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে সিলেট জেলা পরিষদ হল রুমে “ভূমিকম্প ঝুঁকি হ্রাস বিষয়ক অবহিতরকণ সভা’য় বিশেষজ্ঞরা এই মত প্রকাশ করেন। এ সময় তারা বলেন, সিলেট শহরের ৪৬ ভাগ বিল্ডিং ওভারহেঙ্গিং (নকশার বাইরে বেলকনি বা বারান্দা নির্মাণ) এবং ২২ ভাগ বিল্ডিংয়ের সফট স্টোরি (নিচতলায় ওয়ালবিহীন পার্কিং) রয়েছে। ফলে বিল্ডিং গুলো আরো ঝুুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। সিলেটের মাটি সি২-সি২ বেইস (ভরাটকৃত মাটি)। এই মাটিতে ঝাঁকুনি সাধারণ মাটির থেকে ২ থেকে ৭ গুণ বেশি হবে। এই অবস্থায় ভূমিকম্প হলে সিলেটে ভয়াবহ ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিল্ডিং কোড অনুসারে ভবন নির্মাণ, সতর্কতা ও প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন বলে মত দেন তারা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান এমপি বলেন, সরকার আগামী ২০৭১ সালে স্বাধীনতার শতবর্ষে ভূমিকম্প সহনীয় বাংলাদেশ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। বাংলাদেশের মধ্যে ভূগর্ভস্থ ১৪টি বিচ্যুতির মধ্যে ৫টিই সিলেটে। তাই, সিলেট থেকেই এই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। যাতে উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প হলেও সিলেটে কোন ক্ষয়-ক্ষতি না হয়। কোন ভাবেই যেন ভুল ও অনুমোদনহীন নকশায় কেউ ভবন নির্মাণ করতে না পারে-সেদিকে সবাইকে সজাগ থাকার আহবান জানান তিনি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে এবং সিলেট জেলা প্রশাসন ও জাইকার সহযোগিতায় এ সভার আয়োজন করা হয়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মহসীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েট এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ড. তাহমিদ এম আল হোসাইনী এবং বিল্ডিং সেইফটি বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন-গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম ও জাইকার প্রতিনিধি নাওকি মাতসুমুরা। পরে বিশেষজ্ঞ প্যানেল আলোচকদের মধ্যে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ড. জহির বিন আলম, আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. শারমিন রেজা চৌধুরী, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক সামছুদ্দিন আহমদ।

সভায় বিশেষজ্ঞরা জানান, সিলেট শহরে সিডিএমপি’র ২০০৯ সালের জরিপে ৫২ হাজার ভবনের মধ্যে ২৪ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। ৮ লক্ষ জনসংখ্যার ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতি হবে ব্যাপক। তাই বিদ্যমান অবকাঠামো সমূহের ভূমিকম্প সহনীয় করার লক্ষ্যে বর্তমানে ভবনের ভালনারএবিলিটি (ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা) নিরুপন, ভূমিকম্প ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তাৎক্ষণিক একশন প্ল্যান তৈরীর উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

তারা বলেন, সিলেট নগরীতে সম্প্রতি ৭/৮ বার ভূমিকম্প হয়েছে। ভূমিকম্পের ঝুঁকির ভিত্তিতে বাংলাদেশকে ৪ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ৪র্থ ভাগে সিলেটের অবস্থান। তাই বিল্ডিং এসেসমেন্ট, ডিজাইন এবং সুপারভিশনে গুরুত্ব দিতে হবে।

সিলেটে বার বার ভূমিকম্পর কথা উল্লেখ করে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ড. মো. এনামুর রহমান এমপি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সিলেটের কথা ভাবেন বলেই বাজেট অধিবেশনের মধ্যে তাদের সিলেট পাঠিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি মন্ত্রণালয়ের সকলকে নিয়ে সিলেট এসেছেন। তিনি বলেন, ভূমিকম্পে আতংকিত হওয়ার কিছু নেই। আমাদের সতর্কতা এবং প্রস্তুতি থাকলে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সিলেটের জন্য সার্চ এন্ড রেসকিউ যন্ত্রপাতি গতকাল ভোরে সিলেটে পৌঁছেছে। ভূমিকম্পের ঝুঁকিহ্রাসে তিনি প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন ও গণপূর্তসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বিত ভাবে কাজ করার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
‘একজন প্রকৌশলী ভুল করলে পুরো বিল্ডিং এর মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে’ উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিল্ডিং কোড অনুসারে ভবন নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন গুলোকে সংস্কার করে ভবনের শক্তি বৃদ্ধি করা এবং অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভবনসমূহ ভেঙ্গে ফেলার মাধ্যমে ঝুঁকি হ্রাস করা হবে। নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য ভূমিকম্প সহনীয় বিল্ডিং নির্মাণে প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ প্রদান, উন্নত প্রযুক্তি সরবরাহ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সিটি কর্পোরেশনে দক্ষ জনবল বাড়ানো হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন গুলোর ঝুুঁকি হ্রাস এবং বিল্ডিং কোড অনুসারে ভবন নির্মাণ করে আমরা আগামীদিনের জন্য ভূমিকম্প নিরাপদ বাংলাদেশ রেখে যেতে পারবো।

জেলা থেকে উপজেলা পর্যায়ে ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড অনুসরণে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে বিল্ডিং নির্মাণ অনুমোদন কমিটি গঠনের নির্দেশ প্রদান করেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নগরীতে ভূমিকম্পের ঝুঁকি হ্রাসে চলমান আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের রাজউক পার্টকে রিভাইজড এর মাধ্যমে সিলেট সিটি কর্পোরেশনে এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জবাবে প্রতিমন্ত্রী এ বিষয়ে প্রয়োজনী ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন।

অনুষ্ঠানে প্রশ্নোত্তর পর্বে সিলেটে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধে বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম সম্পর্কে বক্তব্য শুনে সরাসরি বলেন, সিলেটে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধে কোন কাজই এখনো হয়নি। সবক্ষেত্রে দক্ষ জনবলের সংকট রয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি। এ ব্যাপারে দক্ষ জনবল তৈরিতে জাপানের সাথে বাংলাদেশ কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের প্রকৌশলীদের এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণের জন্য জাপানে পাঠানো হবে। প্রশিক্ষিত প্রকৌশলীরা এসে ভূমিকম্প সহনীয় বিল্ডিং নির্মাণে ও ব্যবস্থাপনায় কাজ করবেন।

মন্ত্রী বলেন, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধে আমরা বিশ্বে রোল মডেল। ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধেও আমরা রোল মডেল হবো। তিনি সবার বক্তব্য নোট করেছেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিবেন বলে জানান।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপ সচিব আব্দুল্লাহ আল আরিফের উপস্থাপনায় সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন, সিলেট ১৭ পদাতিক ডিভিশনের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজান, সিলেটের জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এডভোকেট লুৎফুর রহমান, মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি মাসুক উদ্দিন আহমদ।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী দেবজিং সিংহ, সিলেটের পুলিশ সুপার ফরিদ উদ্দিন, এসএমপির উপ পুলিশ কমিশনার (উত্তর) আজবার আলী শেখসহ বিভিন্ন উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়রসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ।